উপনিবেশ থেকে সহনিবেশ: একটি কল্পভাষণ / মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়

মা ন বে ন্দ্র  মু খো পা ধ্যা য়

উপনিবেশ থেকে সহনিবেশ: একটি কল্পভাষণ

আয়োজকদের পক্ষ থেকে আজ আমাকে এখানে এদেশের ঔপনিবেশিকতা ও জাতীয়তাবাদের ইতিহাস নিয়ে কিছু বলতে আদেশ করা হয়েছে। আমি ইতিহাসের ছাত্র নই, বাংলা সাহিত্যের নিতান্ত এক সাধারণ কারবারিমাত্র। ঔপনিবেশিকতা ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে এখানে যাঁরা বিস্তর পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও তাত্ত্বিক কথা বলতে পারবেন, আমি তাঁদের কাছে অগ্রিম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি, কারণ আমার এই বক্তৃতাটির মধ্যে চেনা ছাঁদের তত্ত্বকথা না পেয়ে তাঁরা হতাশ হতে পারেন।

প্রস্তুত কোনো ভাষণ আমার হাতে নেই। আজ যখন ট্রেনে চেপে কলকাতার এই সভাস্থলে আসছিলাম তখনই নিজের মনের মধ্যে ডুব মারার একটা সুযোগ এল। ট্রেনে জানালার ধারে সিট পেলে আমি সহসা ভাবুক হয়ে উঠি তা আমার বন্ধুরা বিলক্ষণ জানেন। নিশীথ এসেছে আমার সঙ্গে। ছোটোবেলার বন্ধু। পাড়াগাঁয়ের মানুষ।  কলকাতা বেড়াতে আসার সুযোগ পেলে এখনও ছেলেমানুষের মতো খুশি হয়। ওই বলল, “সোমনাথ, জানালার ধারটা তুমিই নাও ভাই।” নিশীথকে বলছিলাম, স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর বাদেও এইসব অতিচর্চিত বিষয়গুলি নিয়ে কি আদৌ পুনর্কথন করার কিছু আছে? এসব নিয়ে ইতিহাসবিদ্‌ ও সমাজতাত্ত্বিকেরা ঢের কথা তো বলে গিয়েছেন! আমি বাংলা সাহিত্যের ছাত্র, ইতিহাস বা সমাজতত্ত্ব-বিশেষজ্ঞ নই। আজকাল ইন্টার-ডিসিপ্লিনারিটির যুগে একথা বলা যদিও বেমানান তবু মনে রাখতেই হয় দু-টি ডিসিপ্লিন একে অপরের পরিপূরক হতে পারলেও কেউ কারোর বিকল্প হতে পারে না। বিদ্যাচর্চার বাধ্যবাধকতায় আমাদেরও উপনিবেশের তত্ত্বকথা কিছু কিছু পড়তে হয়েছে বই কী। পড়ে যে ঢের লাভ হলো তা-ও মনে হয়েছে অনেক বার। ইতিহাসের দিক থেকে সাহিত্য নিশ্চয়ই পড়া যায়; কিন্তু সে-পড়া নানাবিধ পাঠ-সম্ভাবনার একটিমাত্র দিক! ধরা যাক, এই রেলগাড়ির কথাই। এও তো উপনিবেশেরই এক অভ্রান্ত চিহ্ন! সাহেবরা নেটিভদের কল্যাণের কথা ভেবে তো আর রেলপথ বানায়নি! বানিয়েছিল নিজেদের ব্যাবসাবাণিজ্যের স্বার্থেই। কিন্তু এই রেলপথের সমান্তরাল জোড়ালাইন সোজা গিয়ে ঢুকেছিল গেরস্থের সংসারে। আপনাদের কাছে মার্জনা চেয়ে নিয়ে আমি আমার পূর্বপুরুষদের একটা পারিবারিক কাহিনি শোনাতে চাই।

সে প্রায় একশো দশ বছর আগের কথা। আমাদের দেশের বাড়ির পাশ দিয়ে পাতা হয় কাটোয়া-আজিমগঞ্জ রেললাইন। ঠাকুমার মুখে গল্প শুনেছি, বর্ধমানের কেতুগ্রামের শ্রীরামপুরে আমার দাদু বিয়ে করতে গিয়েছিলেন গোরুর গাড়ি চড়ে। কিন্তু সদ্যপাতা রেলগাড়িতে চড়েই অষ্টমঙ্গলা সেরেছিলেন আমাদের দাদু-ঠাকুমা। এটা কিন্তু আসল গল্পটা নয়। গল্পের শিকড় আরও গভীরে। সেকালে আমাদের দাদুদের ধারণা ছিল সরকারের চাকরি করে কারোর চাকর হতে পারবে না বাঁড়ুজ্যে বংশের কেউ। চাকরি তো চাকরগিরিই বটে! বাঁড়ুজ্যেদের একশো বিঘের সম্পত্তি। এককালে রেশমের গুটিপোকার খোরাকি পাতাচাষের আরও একটা প্রকাণ্ড বাগান ছিল। লাগোয়া গঞ্জের নীলকুঠি-রেশমকুঠির অনেকটা রসদ যেত নাকি আমাদেরই বাড়ি থেকে। সঙ্গে ছিল আম-জাম-কাঁঠালের প্রকাণ্ড বাগান। দুটো মাছে থইথই পুকুর ছিল! তা এসব খাবে কে? ঠাকুমা যখন আমাদের তারাপুরে বউ হয়ে এলেন তখনই ঘটনাচক্রে দাদুর এক ভাইয়ের সাধ হলো কলকাতা দেখার। দেড়শো কিমি দূরের অজ পাড়াগাঁ তারাপুরের কেউ কখনো কলকাতা দেখেনি। রেলপথ হওয়ার পর বিমলানন্দ বাঁড়ুজ্যে সেই যে কলকাতা এলেন অমনি রূপসি নায়িকার মতো কলকাতা তাঁর মনপ্রাণ সর্বস্ব লুঠ করে নিল। সেখানেই থিতু হলেন তিনি। পড়াশোনা, চাকরি-বাকরি, প্রথমে মেসবাড়ি ভাড়া নেওয়া, অসবর্ণ বিয়ে করে পরে ভাড়াবাড়িতে উঠে যাওয়া, আস্তে আস্তে গ্রামের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা, শোকে-দুঃখে দাদুর বাবার মৃত্যু, দাদুর মায়ের উন্মাদ হওয়া— এসব রকমারি নাটকীয় ঘটনা ঘটতে লাগল বাঁড়ুজ্যে বংশে। এইসবের জন্যে ওই রেলপথকেই দায়ী করে তা উলটে যাওয়ার নিত্য মানত করতে করতেই নাকি মৃত্যু হয়েছিল ঠাকুমার শাশুড়ির।

আপনারা হয়তো ভাবছেন, এ কী একটা গল্প হলো? সত্যিই এ ঠিক জমাটি গল্প নয়। কিন্তু ওই যে বোবাপুকুরের মতো নিস্তরঙ্গ একটা গ্রামের একটা যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার পিছনে কারণে বা অকারণে রেলের নাম জুড়ে গেল— ইতিহাসবিদদের তাতে আগ্রহ না-ও যদি থাকে, আমাদের মতো সাহিত্যের কারবারিরা তাকে অনেকটাই গুরুত্ব দিই। ‘বড়ো ইতিহাস’-এর বিচারে এ ঘটনা নগণ্যই বটে, কিন্তু ‘ছোটো ইতিহাস’-এর বিচারে তার দাম আছে। আর একথাটা আমাদের শিখিয়েছিলেন ইতিহাসেরই এক পণ্ডিত অশীন দাশগুপ্ত, তাঁর ইতিহাস ও সাহিত্য বইতে। সুতরাং অনেক ইতিহাসবিদও যে এই গল্পকে নিতান্ত ফেলে দেবেন না, তা আমি নিশ্চিত। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক এ-গল্পে যদি আপনাদের মন না ভরে তাহলে আশাপূর্ণা দেবীর প্রথম প্রতিশ্রুতি উপন্যাসখানা আরেক বার পড়ে দেখুন। উনিশ শতকের সামাজিক ইতিহাসের; ‘ছোটো ইতিহাস’-এর এমন খনি বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ। রেলের  সঙ্গে সমাজকাঠামো বদলের অনেক নিশানা ওখানে নিশ্চিতই পাবেন। অমন বাবা-মা-অন্ত গৃহগতপ্রাণ নবকুমার কলকাতা শহরের মায়াজালে কেমন আটকে পড়ল! এর পাশাপাশি পড়া যাক ইতিহাসবিদ গোলাম মুরশিদের নারী প্রগতি: আধুনিকতার অভিঘাতে বঙ্গরমণী কিংবা অনুরাধা রায়ের সামাজিক ইতিহাসের অসাধারণ সব বই। আমাদের সমাজস্পৃশ্য ইতিহাসের কত বই-ই তো আছে! সব যে সরাসরি রেলগাড়ি নিয়ে তা নিশ্চয় নয়। তবে ওই রেলগাড়িতে উঠে থেকে উপনিবেশসূত্রে রেলের কথাই বেশি মনে পড়ছিল আজ। রেলগাড়ি আর পাটকলের সূচনার সঙ্গে ১৮৬০-এর দশকে ‘বর্ধমান ফ্লু’-র বাড়বাড়ন্ত নিয়ে কম কথা হয়েছে ইতিহাসে? সত্যিই তো, রেল পাততে গেলে ভূমিরূপ বদলে যায়, দু-ধারে তৈরি হয় মশার আঁতুড়ঘর হিসেবে মাইলের পর  মাইল নয়ানজুলি। সেখানে মশা জন্মায়। সাহেবদের সঙ্গে জাহাজে চড়ে ম্যালেরিয়ার প্রোটোজোয়া কলোনি গড়ে অ্যানোফিলিসের পেটে। সেও যেন এক উপনিবেশ কায়েম! নয়ানজুলিতে পাটপচানোর মরশুমে মশার বাড়বাড়ন্ত ঠেকায় কে? অতএব, বর্ধমান ফ্লু মহামারি বর্ধমান ছাড়িয়ে ক্রমবর্ধমান হতে থাকে রেলপথ বরাবর। অন্তত কিছু ঐতিহাসিকের পর্যবেক্ষণ তেমনই। ডা. ইউ.এন. মুখার্জি আবার অন্য একটা থিসিস পেশ করে বসলেন সেসময়। তিনি দেখালেন, বঙ্গের হিন্দুপ্রধান পশ্চিম অংশেই রেলপথের প্রসার বেশি; আর ম্যালেরিয়ার কামড়ে মরছেও বেশি তাই হিন্দুরাই। ফলে হিন্দুরাই হয়ে উঠেছে ‘ডাইয়িং রেস’। সখারাম গণেশ দেউস্কর-এর মতো জাতীয়তাবাদী কেউ কেউ এ তত্ত্বে ধুনো দিয়েছিলেন। ফলে মহামারির জল গড়িয়েছিল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উঠোন পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর ধরে! ইতিহাসবিদেরা বলতে পারবেন, এই যে বাংলার বিশ শতকের ইতিহাসের প্রথমার্ধে সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নিয়ে এত কাণ্ড, তা বয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে উপনিবেশকালের রেলবাবাজির কোনো খেলবাজি আছে কি না? যদি না-ও থাকে তাহলেও এইটে বেশ বুঝতে পারি, রেলগাড়ি কমিয়েছিল আমাদেরে দূরত্ববোধ। আমাদের মুর্শিদাবাদের দেশের বাড়ি থেকে গোরুর গাড়ির রাস্তা হিসাবে কলকাতা ছিল তিন দিনের পথ। সেই পথ কমে হলো ঘণ্টা চারেকের। লোকে এখন বলে না, কলকাতা দেড়শো কিমির পথ। বলে, ঘণ্টা চারেকের জার্নি। মহানগরকে গ্রামবাংলার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার কৃতিত্ব মুখ্যত রেলের। রেলের এবং খানিকটা পোস্ট অফিসেরও। ব্রিটিশ উপনিবেশের অশ্বমেধের ঘোড়ার দুই শাসন বল্গা ওই রেল আর  পোস্ট অফিস। রবীন্দ্রনাথের ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পটা পড়তে গিয়ে আমার খালি মনে হয়, উলাপুরের মতো অমন একটা পাড়াগাঁয়ে পোস্ট অফিস খুলতে হয়েছিল কেন? ন্যূনতম নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যশূন্য গ্রামেও যে একটা পোস্ট অফিস খোলা হয় তাতেই বোঝা যায় উপনিবেশ আমাদের দেশের মানুষের সঙ্গে অন্তরের যোগ গড়ে তুলতে চায়নি বা পারেনি। চেয়েছিল বাইরের দিক থেকে ‘যোগাযোগ’ গড়ে তুলতে; যে ‘যোগ’-এর মধ্যে ‘অযোগ’-টাই ছিল প্রকটরকম! উপনিবেশের শহুরে স্বাচ্ছন্দ্যে লালিত পোস্টমাস্টারবাবুটি যে উলাপুরে মন বসাতে পারবেন না, তারজন্য তিনি সবটা দায়ী নন। উপনিবেশের সামাজিক ফ্রেমই তার কারণ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুলনাচের ইতিকথা-র শশী তো চেয়েছিল গ্রামের কাজে মনোনিবেশ করবে! পারেনি তো! গ্রামের বাইরে বিরাট একটা পৃথিবীর স্বপ্ন তার দু-চোখে এঁকে দিয়েছিল শহর কলকাতাই। গ্রাম আর শহরের দ্বিধাপন্নতায় আচ্ছন্ন হতে হয়েছিল শশীকে; যদিও তার জটিলতার মধ্যে ছিল আরও হাজার গেরো।

আমাদের দেশে ‘ব্রিটিশ উপনিবেশ’ ব্যাপারখানাই এইরকম। এর দু-দিকে দু-রকমের ধার। পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রফেসর সুরেন্দ্র গোপাল তাঁর সম্পাদিত ও ইংরেজিতে প্রকাশিত ইতিহাসবিদ কে.কে. দত্ত শতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘Colonialism has two faces: exploitative and enlightening’। তা কথাটা কি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে? মেকলে সাহেব যে-মতলবেই তাঁর এডুকেশন মিনিটস্‌ লিখে থাকুন; নেটিভরা না-ই হলো তাঁর চাহিদামতো পুরোদস্তুর বাদামি চামড়ার সাহেব— এদেশীয়দের লেখাপড়া শেখা, কেরানিকুল থেকে মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় গড়ে ওঠার ইতিহাস তো আর অস্বীকার করা যায় না! আর আজ যে আমরা রামমোহন রায়ের আড়াইশো বছর উদ্‌যাপন করছি; সেই রামমোহনই যে সাহেবদের এদেশে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য অনুনয় করে চিঠি লিখেছিলেন— সেই পরিস্থিতির বাস্তবতাই-বা আমরা ভুলব কী করে?

ট্রেনের মধ্যে যখন এইসব আগডুম-বাগডুম ভাবনাগুলো নিশীথকে শোনাচ্ছিলাম তখনই ‘চায়ে চায়ে’ হাঁক শোনা গেল। নিশীথ বেচারা আমার বকবকানির অত্যাচার চিরকাল সয়ে আসছে। তবে মাঝেমধ্যে দুয়েকটা কথার পাঁচফোড়ন দিতে ও কসুর করে না। এই যেমন আজ বলে বসল, “সোমনাথ, ট্রেনের কথা দিয়ে শুরু করলে। অথচ টেরও পেলে না তোমার ট্রেন অনেক আগেই ডিরেইলড্‌ হয়ে গেছে!” ওকে বললাম, তাহলে ভাই রেলের কথা থাক। বরং এই চা নিয়েই দু-কথা হোক। সময়োচিত ফোড়ন কেটে নিশীথ বলল, “সেই ভালো। তবে তুমি আমাকে নিয়েও তোমার বক্তৃতার ভাবনা গোছাতে পারো।” বললাম, সেটা কীরকম? নিশীথের বক্তব্য হলো, ও একইসঙ্গে ট্রেন আর চায়ের পালিত সন্তান। সেই হিসেবে খাঁটি উপনিবেশ গোত্রে ওর জন্ম। মানে? মানে আর কিছু নয়। আমাদের বাজারহাটি রেলস্টেশনের গায়ে নিশীথের বাবার ছিল ছোটো একটা চায়ের দোকান। এই নিয়ে নিরীহ নিশীথ আমাকে সময় বুঝে একটা মোক্ষম খোঁচা দিল আর কি! ওকে বললাম, ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও ঠাট্টা-মশকরার নয়। জীবনের পরতে পরতে ইতিহাস গাঁথা। এই যে আমরা লাল চায়ের খোঁজ করছিলাম হকার ভাইয়ের কাছে, এও কিন্তু ইতিহাসেরই অন্তর্গত। আমরা এখন স্বাস্থ্য-সচেতন হয়েছি। আমরা ডায়াবেটিসের ভয়ে খাদ্যাভ্যাস বদলেছি। ছোটোবেলায় কখনো দুধ-চিনি ছাড়া লাল চা খাওয়ার কথা তুমি ভাবতে পারতে? আমার কথা বাদই দিলাম। দীপেশ চক্রবর্তী নামে একজন নামজাদা ঐতিহাসিক আছেন শিকাগোয়। তিনি দেখিয়েছেন, অসুখ-বিসুখ নিয়ে ইদানীংকালের কনশাসনেস কেমন করে বদলে দিয়েছে আমাদের হেঁশেলের হালচাল। আমি অবশ্য পড়েছিলাম চতুরঙ্গ পত্রিকার একটা লেখায়। সেও নাহয় ছাড়ো নিশীথ, কিন্তু এটা তো মানবে আমাদের মাটিতে আসনপিঁড়ি বসে খাওয়ার অভ্যাস কতদিন হলো ঘুচে গেছে? অন্তত এই টেবিল-চেয়ারের ব্যাপারটাকে কি উপনিবেশের চিহ্ন বলে মানবে না তুমি? স্বাধীনতার এত বছর বাদেও আমাদের মনের নিউরোনে-নিউরোনে কি উপনিবেশের চিহ্নরাজ কায়েম হয়ে নেই? তাকে কি মুছে ফেলা সম্ভব? না কি তা মুছে ফেলা তেমন অত্যাবশ্যক? আমাদের চায়ের নেশার ইতিহাস তো আরও জব্বর। সাহেবদের বাণিজ্যিক অঙ্কের দিকটা ছাড়াও স্বাস্থ্যের ধারণার সঙ্গেও তা জুড়েছিল উপনিবেশের পর্বে।

এই কথাটায় বোধহয় নিশীথের একটু হলেও আগ্রহ হলো। সেই সুযোগে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, মনে আছে তোমার কুমুদরঞ্জন মল্লিকের ‘রামসুক তেওয়ারী’ বলে একটা কবিতা পড়তে হয়েছিল আমাদের ছোটোবেলায়? তখন কবিতাটাকে নেহাত মজার একটা কবিতাই মনে হতো। বড়ো ক্লাসে কবিতাটা আরেকরকমভাবে ধরা দিল আমার কাছে। বাংলায় এসে চায়ের নেশা ধরেই যে রামসু্কের ‘আজ বাড়ে অম্বল কাল বাড়ে পিত্ত’ মনে হলো কবির— এইটেই বিশেষ করে খেয়াল করার বিষয়। এইরকম মনে হওয়ার পিছনে আছে ‘চা’ বস্তুটি সম্পর্কে নেশাটির সূচনাপর্বে বাঙালির একাংশের গভীর সংশয়। রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে চায়ের বিজ্ঞাপন করানো হয়েছিল বটে, কিন্তু বাঙালির মনে চা নিয়ে সংশয় বিশ শতকের অনেকটা সময় পর্যন্তই জুড়ে ছিল। সংশয়ীদের মধ্যে পুরোভাগে ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। ‘চা-পান ও দেশের সর্বনাশ’ শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেছিলেন তিনি। ১৩৩৮ সালে মাসিক বসুমতী পত্রিকায় বেরিয়েছিল দু-কিস্তিতে। তো এই যে দেশের মানুষের স্বাস্থ্যের ভালোমন্দের ভাবনা— এও আসলে উপনিবেশ পর্বের হাজারমুখো জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনার অন্যতম। জাতীয়তাবাদ মানে তো আর শুধু “বন্দেমাতরম্‌” স্লোগান নয়! স্বাস্থ্য কেমন করে সমষ্টি মানুষের, বলা যায় সমাজ বা রাষ্ট্রের ‘স্বাস্থ্য’ হয়ে ওঠে— তা ছাত্রবেলায় শান্তিনিকেতন পত্রিকা ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে বুঝেছিলাম। বিশ শতকের দ্বিতীয়-তৃতীয় দশকের কথা। দেখছি, যে-বছর শান্তিনিকেতন আশ্রমে অসুখ-বিসুখ কম হচ্ছে সে-বছরের আশ্রমিক প্রতিবেদনে লেখা হচ্ছে, ‘এ বছর আশ্রমের স্বাস্থ্য ভালো’। উপনিবেশ পর্বের স্বাস্থ্যের ধারণার সঙ্গে অনেকসময় জাতীয়তাবাদী চেতনার কীভাবে জারণ ঘটত, রামসুকের গল্পটা কিন্তু তার মোক্ষম উদাহরণ। রামসুকের ওই ‘কী গভীর পেটটি’ যদি তোমার হয় (হয়েছেও দেখছি খানিকটা!) তা হলে তোমাকে আজ আর কেউ স্বাস্থ্যবান বলবে না। বলবে ভুঁড়িয়াল, বলবে অস্বাস্থ্য। রামসুকের নেশা ছাড়িয়েছিল তার হিন্দুস্তানি দেশোয়ালি ভাই। তার খাদ্যাভাস আবার বদলে হলো দেশিরকম। দেশি প্রথায় শারীরিক কসরত পুনর্বহাল হলো তার জন্য। শুধু খাদ্যাভাসেরই স্বদেশীকরণ হলো তা-ই নয়, তার অভ্যাসে অন্তর্গত হলো ভোরবেলায় তুলসীদাসের রামায়ণ পাঠ! আমাদের উপনিবেশ পর্বের জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনার সঙ্গে এই ধর্মের সিন্থেসিস একটা ছিলই। শুধু সাহিত্যচর্চার ব্যাপার এ নয়। আর তার কারণও জলবৎ সহজবোধ্য। এদেশের ব্যাপক সাধারণ মানুষের গণচৈতন্যের সঙ্গে যদি সংযোগ গড়তেই হয়, ধর্মের মাধ্যস্থ ছাড়া তার উপায় কী? গান্ধীজিকে যখন দেশের ব্যাপক এলাকার মানুষ ‘রামচন্দ্রের অবতার’ কল্পনা করে নানা অলৌকিক ঘটনার অবতারণা করছিলেন, তখন কংগ্রেস নেতারা যে তাদের সে ভুল ভাঙাবার চেষ্টাও করেন না তার কারণ কি এই নয় যে এই অন্ধবিশ্বাসটা জিইয়ে রাখার মধ্যেই রাজনীতির লাভ? শাহিদ আমিন গান্ধী যখন মহাত্মা প্রবন্ধে এ নিয়ে চমৎকার লিখেছেন। এই বাস্তবটাই সাহিত্যে দেখিয়েছেন ঢোঁড়াইচরিত মানস-এ সতীনাথ ভাদুড়ী, কণ্ঠপুরা-য় রাজা রাও আর ওয়েটিং ফর মহাত্মা-য় আর.কে. নারায়ণন।

নিশীথ জানতে চাইছিল, ‘বন্দেমাতরম্‌’ গানে ওই ‘ত্বং হি দুর্গা’ কথাটাও এই সুবাদেই এসেছিল কি না? ওকে বলছিলাম, হিন্দুমেলা পর্যন্ত ‘হিন্দু’ শব্দটা ‘ন্যাশনাল’ শব্দের বিকল্প হিসেবেও ভাবতে পারি। নবগোপালের মিত্রের নামের আগেই তো জুটেছিল ‘ন্যাশনাল’ খেতাব! রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতির সাক্ষ্য থেকে জানা যাচ্ছে, গীতা-হাতে শপথ-টপথের ব্যাপার-স্যাপারও তখন জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে এসে গেছে। এর সঙ্গে শাক্ত অনুষঙ্গ, ক্ষাত্রবীর্যের জাগরণ এসব ব্যাপক প্রশ্রয় পাবে বোধহয় ‘বন্দেমাতরম্‌’ গানের পর।

এইসবই তো আপনাদের চেনা গল্প। তবে এ-ব্যাপারে এই অনধিকারীর একটা ছোট্টো ফুটনোট আছে। এখন হিন্দুত্ববাদীরা— মায় দলমত-নির্বিশেষে মডারেট দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদীরাও যে ‘বন্দেমাতরম্‌’ স্লোগানে আকাশ বিদীর্ণ করে ফেলেন; বঙ্কিমের সময় এক শ্রেণির কট্টর হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরাই আবার সেই ‘বন্দেমাতরম্‌’ লেখার জন্যই প্রবল ধিক্কার জানিয়েছিলেন সাহিত্য সম্রাটকে! বাংলা সাহিত্যের ‘পাঁচু ঠাকুর’ ওরফে ‘পঞ্চানন্দ’ ওরফে ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তো সরাসরিই বলেছিলেন এ-গান বিলাতের ‘Rule Britannica’ গানের অনুকরণ ছাড়া কিছুই না! লিখেছিলেন ইন্দ্রনাথ, এ হলো ‘সেবাদাসী পথে কুড়ানো Hail Mother-কে শাঁখাসাড়ী (য.) পরাইয়া চণ্ডীর পবিত্র মণ্ডপে বসাইবার চেষ্টা।’ ইন্দ্রনাথকে খুব দোষ দেওয়া যায় না বোধহয়। নেশন-ন্যাশনালিটি  ধারণাগুলির সঙ্গেই যে তখন আমাদের সবে পরিচয় হচ্ছে। জাতীয়তাবাদের পরিচয় পাকাপোক্ত হতেই আর কেউ বঙ্কিমকে দোষারপ করেননি। কী আশ্চর্য দেখুন! সেই থেকে আমরা জাতীয়তাবাদের প্রেরণাও খুঁজে নিচ্ছি   উপনিবেশকদেরই কাছ থেকে! একভাবে দেখলে অবশ্য ব্যাপারটাতে আশ্চর্য হওয়ারও কিছু নেই। দুনিয়াজোড়া নেশন-স্টেটের সেই দাপট থেকে পৃথিবীর কোন্‌ অন-উপনিবেশিত জাতিই-বা ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলতে পেরেছে? প্রকাণ্ড একটা বিমূর্ত রাষ্ট্রতন্ত্রের বদলে ‘মানুষে-মানুষে আঁটি-বাঁধা’ স্পর্শসংবেদী ঘননিবদ্ধ মানবসমাজকে ভিত্তি করে রাষ্ট্র গড়ে উঠলে হয়তো রবীন্দ্রনাথ-গান্ধীর তত আপত্তি থাকত না। সে যাই হোক, মজার কথা হচ্ছে উপনিবেশের সূত্রেই আগ্রাসন বেড়েছে আবার উপনিবেশের প্রতিক্রিয়াতেই জাতীয়তাবাদ ছড়িয়েছে! ইতিহাস খুঁড়লে এমন বহু প্যারাডক্সের হদিশ মেলে। তারও অবশ্য আছে কার্যকারণ সম্বন্ধ। তবে মনে রাখতে হয়, উপনিবেশ আর  জাতীয়তাবাদের চরিত্র মোটেই একমাত্রিক নয়। এর ইতিহাসের মধ্যে রয়ে গেছে হাজার পাকে জড়ানো সুতোর মতো অজস্র গিঁট। ভাষাচার্য সুনীতিকুমার একবার একটা নিবন্ধে প্রসঙ্গত ‘যোগক্ষেম’ বলে একটা শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। অন্যের থেকে পাওয়া জ্ঞান রক্ষণ ও নিজের জ্ঞানের প্রস্ফূরণ-জাতীয় কী একটা মানে করা ছিল তাতে। আমার কেমন মনে হয়, আমাদের ওই জাতীয়তাবাদের ধারণাটাও একরকম যোগক্ষেম। ঘোরতর জাতীয়তাবাদী বলেন যাঁরা নিজেদের, সেই স্বয়ংসংঘীদের কালচারের ফরম্যাট বিশ্লেষণ করলেও মনে না হয়ে যায় না যে ওটিও একশো শতাংশ খাঁটি স্বদেশি ব্যাপার নয়! আবার ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’র গীতিকারের ‘যেদিন সুনীল জলধি হইতে’ গানেরও তত্ত্বতল্লাশ করলে কোনো এক ইংরেজি স্বদেশি গানই উঠে আসবে বলে কোথায় যেন পড়েছিলাম! এতে দোষের কিছু নেই। ব্যাপারটা ওই ‘যোগক্ষেম’-জাতীয়ই মনে হয়।  পশ্চিমের মশাল থেকেই আসলে আমরা আমাদের মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে নিয়েছি। এখন মশাল আর প্রদীপের জাতগোত্রের বিচার চলতে পারে। আলোটার জাতবিচার করব কীভাবে? আর তা করা খুব জরুরিও কি আজ?

আমরা অবশ্য ‘রাষ্ট্র’ শব্দটি জানতাম বেদের যুগ থেকেই। ঋগ্বেদ-এই না আছে ‘অহং রাষ্ট্রী সংগমনী বসূনাং—’ বাক্‌সূক্ত? কিন্তু ‘রাষ্ট্রী’ বলতে এখানে অর্থ ‘জগদীশ্বরী’। আমরা বোধহয় ‘রাষ্ট্র’ বলতে স্পর্শযোগ্য, ইন্দ্রিয়গম্য অনিঃশেষ আধারজোড়া একরকম পরমাত্মিক বিস্তারকেই বুঝেছিলাম। পশ্চিমের একালীন ‘নেশন-স্টেট’কে নিশ্চয়ই নয়। তাই দেশমাতৃকার পায়ে মাথা ঠেকানোটুকুতেই রবীন্দ্রনাথের ‘দেশপ্রেম’ ফুরিয়ে যায় না। তিনি দেখান সেই দেশের ব্যাকড্রপে রয়ে গেছে ‘বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা’। তাঁর জাতীয়তাবাদ সংকীর্ণ জাতীয়তার সমালোচনা করে সামাজিক জাতীয়তাকে প্রতিষ্ঠা করে। বঙ্কিমচন্দ্রও তাঁর ধর্ম্মতত্ত্ব বইয়ের চব্বিশতম অধ্যায়ে  গুরুর জবানিতে বলেন, ‘ইউরোপীয় Patriotism একটা ঘোরতর পৈশাচিক পাপ!. . . জগদীশ্বর ভারতবর্ষে যেন ভারতবর্ষীয়ের কপালে এরূপ দেশবাৎসল্যধর্ম্ম না লিখেন।’ রবীন্দ্রনাথের ন্যাশনালিজ়ম বক্তৃতাগুলির মধ্যে যত উষ্মা— সেও তো এইখানেই। আর রবীন্দ্রনাথের মতো উপনিবেশের যথাযথ ‘যোগক্ষেম’-এর সূত্রে একটা বিকল্প সাংস্কৃতিক পরিসর হিসেবে শান্তিনিকেতন গড়ে তোলার মতো বিপুল উদ্যম কোন্‌ ভারতীয় মনীষীই-বা নিতে পেরেছেন?

আমি রবীন্দ্রনাথের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট— এমন একটা অনুযোগ নিশীথ প্রায়শই করে থাকে। নিশীথ বোধহয় বঙ্কিমচন্দ্রের অঘোষিত ভক্ত। দেশের হাজার-হাজার নিশীথ সোচ্চারে-অনুচ্চারে বঙ্কিম-অনুরাগী। জানি না, তাঁদের ক-জন আনন্দমঠএর পাশাপাশি বঙ্কিমের এই লেখাগুলো পড়েছেন!

আজ ট্রেনে রবীন্দ্রনাথের কথা কমই বলেছি নিশীথকে। বলার মধ্যে শুধু এইটুকু বলেছি, রবীন্দ্রনাথ ‘ভারতবর্ষ’ ধারণাটার অন্তঃসারকে বুঝতে চেয়েছিলেন। না, শুধু গোরা-র কথা নয়। অন্তঃসারের পরিচয় পেতে হলে তাঁর অজস্র কৃতির আরেকটু অন্দরে যেতে হবে। আর সব বাদ দিয়ে তুমি যদি শুধু বিশ্বভারতীর ঋতু-উৎসবগুলোর দিকে তাকাও, তাহলেই বুঝতে পারবে সময়ের ভারতীয় চক্রাবর্ত ধারণাটিকে কীভাবে শান্তিনিকেতন আধুনিকরকমে গ্রহণ করেছিল। আর এই যে সময়বোধ— এ কিন্তু স্পৃশ্যসময়; পশ্চিমের ঘড়িশাসিত আধুনিক সময় সে নয়।

কথাটা বোধহয় নিশীথ ঠিক বুঝল না। ওকে আরেক প্রস্থ বোঝাবার চেষ্টা করি। শীতকালে গায়ে খড়ি উঠলে, চামড়ায় টান পড়লে গাঁয়ের চাষি মানুষটিও বুঝতে পারে প্রকৃতির মধ্যে সেও কেমন একাকার হয়ে আছে। প্রকৃতিতে যখন ঋতুতে ঋতুতে রং বদলায়, মানুষের শরীরেও তখন বার্তা আসে সেই বদলের। ঋতুর বদল আসে চাকার মতো ঘুরে ঘুরে। মানুষ যদি স্পর্শানুভবে বুঝতে পারে সেই বদল তখন সেও প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে একটু মিলিয়ে নেওয়ার আনন্দোৎসব তো করবেই। শান্তিনিকেতনের ঋতু-উৎসবগুলো হলো প্রকৃতির সঙ্গে মিলবার গরজেরই নান্দনিক প্রয়াস। এবার এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কিছু নাটক; এমনকী নাট্যভাবনাও জুড়ে নেওয়া যায় অনায়াসেই। একে কি নেহাত ‘কবির খেয়াল’ বলা যায়? এ তো হিমশৈলের চুড়োমাত্রও নয়। ওদিকে বাকি রইল তাঁর ‘স্বদেশী সমাজ’, তাঁর ‘আত্মশক্তি’-মন্ত্র, শ্রীনিকেতন, আরও কত কী! সেসব তো খালি চোখেই দেখা যায়। আমি বলছি, তাঁর স্বদেশবোধের; এবং সেই সুবাদে উপনিবেশ-মোকাবিলার সেইসব প্রকার-প্রকরণের গূঢ়কথা যা আসলে বাহ্যত কোডিফায়েড হয়ে আছে আমাদের সামনেই। ওগুলো ডিকোড করা যায়। যেমন, আমার এক শান্তিনিকেতনের বন্ধু তার রবীন্দ্রনাথ: আশ্রয় ও আশ্রম বইতে  লিখেছে, প্রাচীন তপোবনকে এযুগের মতো করে অনুবাদ করে নিয়ে গাছতলায় ক্লাস বসাবার পরিকল্পনাটার মধ্যেও আছে আমাদের সাবেক মণ্ডলীমুদ্রার চিহ্ন-সংকেত। তপোবনের আদলে যজ্ঞ তিনি করেননি বটে, কিন্তু শিক্ষার মহাযজ্ঞ শুরু করেছিলেন গাছতলায়, একরকম মণ্ডলীর ছাঁদে। ঔপনিবেশিক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক থেকে ছাত্রের দূরত্ব ক্রমশ ফার্স্ট বেঞ্চ থেকে লাস্ট বেঞ্চ পর্যন্ত বাড়তে বাড়তে যায়। এই লিনিয়ার ডিসট্যান্সিং একেবারেই থাকে না মণ্ডলী-ছাঁদে। এও কি কিছু কম চিহ্ন-সংকেতময়? তো সে যাক। এখন উপনিবেশিত সময়ের তিরের মতো শুধু এগিয়ে চলার মোকাবিলা রবীন্দ্রনাথ করবেন কীভাবে? আমার মনে হয়, সে কাজটা তিনি করবেন সময়কে স্রেফ ইগনোর করে! কালিদাস আর তাঁর মেঘদূত যে রবীন্দ্রনাথের এত প্রিয় হয়ে উঠেছিল তার কারণ কি ওর মন্দাক্রান্তা ছন্দটিও নয়? ছিন্নপত্রাবলীর পাতায় পাতায় দেখি আলস্যযাপনকে মহিমান্বিতই করে চলেছেন কবি। কলকাতা শহর থেকে দূরে প্রকৃতির নিভৃতিতে এই যে একটা স্পেস গড়ে নেওয়া, এ তো আসলে শুধু স্পেস নয়; একটা আলাদা টাইম-স্পেস। জমিদারি করতে গিয়ে এ অন্য এক স্থান-কাল সন্ততির সযত্ন রচনা, যেখানে জমিদারির কাজের কথা একবারের তরেও নেই! এই আলস্যযাপনের সঙ্গেই কি মিলে যায় না তাঁর ঋতুনাট্যগুলিরও কোনো-কোনোটি? হয়তো সবসময় নজরে পড়ে না, কিন্তু তাকিয়ে দেখলে বোঝা যায় উপনিবেশ পর্বের বিচিত্র টানা-পোড়েনের ইতিহাসের নানা নকশা ফুলের মতো ফুটে আছে রবীন্দ্রসাহিত্যে ও জীবনে। কলাবিদ্যা প্রবন্ধে ইউরোপের ‘রুচিস্বাতন্ত্র্যনাশক’ মরু-হাওয়ার হাত থেকে এদেশের প্রতিষেধ গড়ে তোলার নান্দনিক উপায়ের কথা বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। খুঁটিয়ে দেখলে আরও কত চিহ্ন, কত নকশার ইশারা যে অবিরত তাঁর কাছ থেকে খুঁজে পাওয়া যাবে তার ইয়ত্তা নেই।

নিশীথ আরেক প্রস্থ চায়ের অর্ডার দিয়ে বলল, “ওই দেখো হাওড়া ব্রিজ দেখা যাচ্ছে। ওর মধ্যেও তুমি নিশ্চয় একটা চিহ্ন-টিহ্ন খুঁজে পাবে!” বোঝা গেল আমার এই একপাক্ষিক বকে-যাওয়া ওর একটুও ভালো লাগেনি। আমি বললাম, অবশ্যই। ওটা দূর থেকে দেখলে মনে হয় না যেন কলোনাইজ়ার নামের এক সাহিত্যিকের অটোগ্রাফ রয়ে গেছে কলকাতা নামের উপন্যাসটার টাইটেল পেজে? এই কথাটাও আমাকে একবার ধরিয়ে দিয়েছিল আমার সেই শান্তিনিকেতনের বন্ধু। তার রৌদ্রছায়ার গদ্য বইতে বোধহয় কথাটা আছেও। সে আরও বলেছিল, ‘পদ্মাতীরে বসে উনিশ শতকীয় কলকাতা শহরটাকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের যে ক্ষোভ— আমার তা নেই। আমার ধারণা আমাদের কালের কারোরই তা থাকার উপায় নেই। সত্যি বলতে আমিও তো সুবিধেমতো হলে একটা ফ্ল্যাট খুঁজছি কলকাতা বা তার আশপাশে।’

সত্যিই তো। কী আর করা যাবে? আমাদের দেশে এখনও ভদ্রস্থ চিকিৎসাটুকু পেতে গেলেও শহর বিনা গতি নেই। তা ছাড়া আমরা রাগ দেখাবই-বা কার উপর? আমাদের দেশে গ্রাম-শহরে আজও তফাত ঘোচেনি। রবীন্দ্রনাথেরই কোন্‌ একটা লেখায় পড়েছিলাম ইংলন্ডের দশাও নাকি এরকমই ছিল। এই প্রভেদ ঘোচাবার চেষ্টা হয়েছিল বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায়। কিন্তু হায়! সে সোশিয়ালিজ়মও নেই, সে সোভিয়েতও নেই। তো রাগটা করব কার উপর? ভরসাই-বা করব কোন্‌ ‘যদা যদা হি’ বলে আবির্ভূত হওয়া অবতারকে?

নিশীথ ফুট কেটে বলল, “স্টেশনে নেমে মাটিতে পা রেখে এইবার আসল কথাটা বেরোল। এতক্ষণ তো হাওয়ায় ভাসছিলে বন্ধু! ট্রেনে আলস্যযাপনের প্রকৃষ্টতম পন্থা হলো টেনে ঘুম মারা। তার বারোটা বাজিয়ে এই এত বক্তৃতা শোনার কোনো মানেই তো খুঁজে পাচ্ছি না এখন। তোমার এত বাগাড়ম্বরের সারকথাটা কী? তোমার কাছ থেকে আজকের সভার শ্রোতারা কোন্‌ কথাটা শুনে ধন্য হবে তা আমার মাথায় কিন্তু কিচ্ছু ঢুকল না! দেখো, তোমার সব শ্রোতা আজ উঠে যাবে বক্তৃতার মাঝপথেই।“

নিশীথকে তখন শান্ত করার প্রযত্ন করতেই হলো। এমনিতে ও খুব ভদ্রভব্য। কিন্তু বিগড়ে গেলে মোষের মতো গোঁ ধরে বসে। আজ আবার অভিসম্পাত পর্যন্ত দিয়ে বসল! বাংলা নিয়ে অনার্স গ্র্যাজুয়েট হয়েছে বটে তবে তেমন চাকরি-বাকরির সুযোগ আসেনি নিশীথের। ব্যাবসাটা অবিশ্যি নিজের উদ্যোগে ভালোই বাড়িয়েছে। আমি কোচবিহারের একটা কলেজে বাংলা পড়াই। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা। নিশীথ আমার পিতামাতার খোঁজখবর নেয়। সুতরাং নিশীথ বিগড়ে গেলে আমার ফিফটি পারসেন্ট শিক্ষিত হিসাবি বুদ্ধি আর থার্টি পারসেন্ট কৃতজ্ঞতার সঙ্গে টোয়েন্টি পারসেন্ট ভয়ের একটা অনুভূতি কাজ করে। নিশীথকে চটানো যায় না। ওকে বললাম, ঠিক আছে এবার অন্য একটা খেলার মতো কিছু শুরু হোক। খেলাটা হবে উলটো পাকে খোলার। ইতিহাসের পানসি তবে চলুক এবার উলটো পাকে। বেশ বেশ, হেঁয়ালি রাখছি। শোনো তোমার প্রশ্নের উত্তর। পরিষ্কার করেই বলি এই ট্যাক্সিতে যেতে যেতে।

মনে করো— বাবার মুখে যেমন শুনেছি— আমাদের মুর্শিদাবাদ জেলাটাই নাকি পাকিস্তানে পড়ে যাচ্ছিল দেশভাগের সময়। সাতচল্লিশের চৌদ্দ অগস্ট দিবাগত মধ্যরাত্রে নেহরু যখন ‘ট্রিস্ট উইথ ডেস্টিনি’র কথা শোনাচ্ছিলেন আবেগমথিত কণ্ঠে, তখন আমার ঠাকুমা চোখের জল ফেলে ফেলে পুঁটুলি বাঁধছিলেন দেশান্তরী হতে হবে বলে। ভাবো তো, সত্যি যদি আমরা পাকিস্তানে গিয়ে পড়তাম তাহলে এই কলকাতা শহরটা আসতেও আমাদের আজ পাসপোর্ট-ভিসা লাগত! হয়তো আমাদের ন্যাশানিলিটি এখন  লিখতে হতো ‘বাংলাদেশি’। তাত্ত্বিক আলোচনায় তাতে কিছু যেত-আসত না, কিন্তু আজকের আলোচনার ব্যাবহারিক অর্থ তখন অনেকটাই বদলে যেত আমার কাছে। ফরাক্কা থেকে যেমন করে গঙ্গা আর পদ্মা ভাগ হয়ে গেছে— তেমনি সাতচল্লিশ থেকে দুটো ধারায় ভাগ হয়ে গেছে দুই ভূখণ্ডের ইতিহাস। আরেকটা সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখো। মনে করো, ইংরেজ আমাদের দেশে উপনিবেশ কায়েমই করেনি কোনোদিন! তাহলেও কি আজ এই গ্লোবালাইজ়েশনের যুগে পশ্চিমা প্রভাব কিছু পড়ত না আমাদের দেশে? আমি তো বাংলা সাহিত্যের ছাত্র, তাই সাহিত্যের ইতিহাস ধরেই বলি। উনিশ শতকে বাংলা গদ্য, বাংলা সাহিত্য, পুথির বদলে ছাপা বইয়ের প্রচলন ঘটার ফলে যে আমূল একটা সাংস্কৃতিক বদল এসেছিল— সেসব কি পঞ্চাশ বছর বাদে হলেও ঘটত না? তাহলে তো বলতে হয় যেসব দেশে উপনিবেশ কায়েম হয়নি কোনোকালে, সেসব দেশ স্থবির হয়ে থেকে গেছে কোনো এক পুরোনো সময়ের পিঞ্জরে! তা তো হয়নি। বাংলাদেশের বিখ্যাত নাট্যকার সেলিম আলদীনের মনে হয়েছিল, ইংরেজের সংস্পর্শে না এলে আমাদের নাটক হতো অন্যরকম। চর্যাপদ বা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর যুগ থেকে সত্যিই তো দেশি রকমের একটা নাট্যধারা ছিল। এখন আলদীন করলেন কী— ওই ধারাটা বজায় থাকলে কেমন হতে পারত আমাদের বাংলা নাটকের চেহারা তার হদিশ নেওয়ার চেষ্টা করলেন। এক্সপেরিমেন্ট হিসেবে এটা দারুণ একটা ব্যাপার হলো বটে, কিন্তু সেই লেবেদেভ-এর সময়ের আগে থেকে ‘কখনো উপনিবেশ কায়েম না-হওয়া’ অন্তত দুশো বছরের একটা সময় পর্বে ইংরেজি সাহিত্যের কোনো স্পর্শ লাগত না বাংলায় তাই-বা কে হলফ করে বলতে পারে? এই হাইপোথেটিক্যাল ইতিহাসটা  তখনই খানিকটা হয়তো মেনে নেওয়া যায় যদি ধরে নিই পৃথিবীতে কোথাও কোনোদিন ব্রিটিশ উপনিবেশ গড়ে ওঠেনি, কিংবা ইংলন্ড বলে একটা অজ্ঞাতকুলশীল কোনো দেশ মানচিত্রে ছিল বটে; কিন্তু পৃথিবীতে প্রায় কেউই তার খোঁজ জানত না! এই কল্পনায় পাখা মেলার মানে নেই কারণ উপনিবেশ কায়েমের বীজ পোঁতা ছিল রেনেসাঁস-জ্ঞানদীপ্তি-শিল্পবিপ্লব ইত্যাদি ঐতিহাসিক ঘটনাপরম্পরায়। পাঁচশো বছর আগে কোনো এক ভাষায় একজন শেক্সপিয়র-এর আবির্ভাবও অকারণে ঘটে না। এদিকে পাঁচশো বছর আগে আমাদের দেশেও কিন্তু তাবড় তাবড় মহাপুরুষরা জন্মেছিলেন। ধরা যাক, আমাদের বাংলার চৈতন্য-ভাবাদর্শের কথা। ওই ভাবাদর্শ যদি দুশো বছরে ম্লান হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে তার দায় ইংরেজদের ঘাড়ে তো চাপাতে পারব না! হিতেশরঞ্জন সান্যাল, অবন্তীকুমার সান্যাল প্রমুখের বই পড়ে অন্তত আমার মনে হয়েছে, আমরাই পারিনি সেই আলো মুঠোয় ধরে রাখতে। আমাদের প্রাক্‌-ঔপনিবেশিক বিশুদ্ধ দেশীয় সমাজকাঠামোর মধ্যে ছিল কোনো কোনো বিভেদবুদ্ধিরও ছিদ্র। জাতির জীবনে সে-ই হয়ে উঠেছে ‘ট্রাজিক ফ্ল’। এইজন্যই হয়তো মার্কসবাদীরা বলেন, শ্রেণিচেতনার জাগরণ না হলে কোনো রেনেসাঁসই ঠিক রেনেসাঁস নয়। তা হলে আবার প্রশ্ন, রাশিয়ায় কি আদৌ বলশেভিক বিপ্লব সফল হয়েছিল? না কি এও ছিল নেহাত ওই উপরতলের ভোলবদল? ইতিহাস এত ব্যাপক একটা গতিপ্রবাহ যে চাইলেই তার গতি বদলে ফেলা যায় কি না আমার অন্তত সন্দেহ আছে। ডায়ালেকটিক্স তত্ত্ব দিয়ে এই গতির অভিমুখের একটা আন্দাজ হয়তো করা যেতে পারে, তার বেশি ভবিষ্যৎ-নির্মাণ কীভাবে সম্ভব? সেজন্যই আমার মোদ্দা কথাটা হলো, সময়ের উজানে যাওয়ার এই বিলাসী খেলাটা না খেলে শুধু অতীত থেকে কিছু শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ রচনার কাজে লাগালে তবেই ইতিহাসবিদ্যাটা কাজে আসে। কবে কে কোথায় মন্দির ভেঙে মসজিদ বানিয়েছিল, কিংবা মসজিদ ভেঙে মন্দির— তাতে আটকে পড়ে থাকলে বৌদ্ধরা এসে বলবে অমুক মন্দিরটা আমাদের ছিল। এবার ফেরত দাও। শক্তপোক্ত তথ্যভিতের উপর দাঁড় করানো শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলান্তর নাটকে পড়েছি বৌদ্ধ আর জৈনের মতো অহিংসবাদী সম্প্রদায়ও কেমন অতীতে পরস্পর হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল! সুতরাং নিকটতর অতীতের সাম্প্রদায়িক হানাহানির রেশ বজায় রাখতে গেলে দূর অতীতে বৌদ্ধ-শৈব হানাহানির গ্লানি নাড়া খেয়ে ভেসে ওঠার সম্ভাবনা অমূলক নয়। আমি বলতে চাই, আজকের এই উপনিবেশ-জাতীয়তাবাদের আলোচনাগুলোও অতীত থেকে মুখ ফিরিয়ে ভবিষ্যৎমুখী হোক। ইতিহাস একটা মায়াদর্পণ। ওকে চাই আমাদের। কিন্তু ওর কুহকবৃত্তির বন্দিত্ব থেকে মুক্তি চাই।

কথাটা নিশীথের বেশ মনঃপূত হবে ভেবে আত্মপ্রসাদ পাওয়ার আগেই ট্যাক্সি ও মহানগরের কোলাহল ছাপিয়ে শোনা গেল ওর নিবিড় নাসিকাগর্জন! ড্রাইভারকে ‘রোক্‌কে’ বলে চলে এলাম আপনাদের কাছে।

অগত্যা সেই শেষ কথাটুকু সরাসরি বলি আপনাদেরই। জানি এসব কথায় আরও হাজার-কাহন কথা উঠবে। অনেকেই এতক্ষণে নিতান্ত ধৈর্যচ্যুত হয়েছেন। কেউ আমাকে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া ভাবছেন তো কেউ ভাবছেন আমড়া আঁটির সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী। কেউ বলবেন, এদেশে উপনিবেশ তো হয়েছে সেই মুসলমান আমলে!   অমনি শুরু হবে আরেক প্রস্থ বিতণ্ডা। আর্যরাই যে এককালের উপনিবেশক নয় তাই-বা আপনাকে কে বলল?—হেঁকে উঠবেন অপর পক্ষ। ইতিহাসের চক্রক দোষ এড়াবার জন্য আমি কিন্তু বলব, এঁরা কেউই উপনিবেশক নন। আর তা নইলে মানতে হয়, আফ্রিকার সেই মূলবাসীরা, যাঁদের থেকে পৃথিবীময় মানবগোষ্ঠী ছড়িয়ে পড়েছিল বলে নৃতত্ত্ববিদেরা উল্লেখ করে থাকেন; তারা ছাড়া পৃথিবীর সব জাতিই হয় উদ্‌বাস্তু নয়তো উপনিবেশক।

এতেও যদি আপনাদের মনে হয়, এ কেবল কথার খেলা আর হাওয়ার দার্শনিকতা— তাহলে আবার মূল প্রসঙ্গে ফিরে এসে সোজাসুজি বলি: ‘উপনিবেশ’ কথাটার মানে হলো ‘উপ’ অর্থাৎ সমীপে বা নিকটে নিবেশন বা অবস্থান করা। শব্দটার মধ্যেই একটা ‘আদারনেস’-এর ব্যঞ্জনা আছে। ‘উপ’। কার সাপেক্ষে ‘উপ’? যে আগে থেকে বসে আছে তার সাপেক্ষে নিশ্চয়। যত গোলমাল সাপেক্ষবাচী ‘আদারনেস’-এর ওই মানসিকতার মধ্যে। যদি আমি জানি, যে বসে আছে সে আমার সাপেক্ষে বসে নেই; বসে আছে আমার মতো অনেক ‘আমি’র সমবায়ে গড়ে ওঠা একটা ‘আমাদের’-এর অন্তর্গত হয়ে তাহলে ওই ‘উপ’ কথাটা এখানে নিতান্তই নিরাবলম্ব হয়ে যায়। আর্য বা মুসলমানদের ক্ষেত্রে ‘উপ’ কথাটা কি আজ আর খাটে? ইংরেজ শাসন-শোষণ করে তল্পিতল্পা গুটিয়ে এদেশ ছেড়েছে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর উপনিবেশ সেইসব উপনিবেশিত জাতিগুলির সংস্কৃতির জিনেটিক গড়ন পর্যন্ত যেভাবে বদলে দিয়েছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ ঠিক ততটা পারেনি। পারেনি সে তাদের মাহাত্ম্যের কারণে নয়।  তাদের লক্ষ্য ছিল স্বতন্ত্র। বিরাট দেশ ভারতবর্ষের পরিস্থিতিও ছিল স্বতন্ত্র। আজকের বিভেদবুদ্ধি তাদের কাছ থেকেই আমরা পেয়েছি এইটে বলার মধ্যে কোনো আত্মশ্লাঘা থাকার কথা নয়। মেনে নিতে হবে, বিভেদের ছিদ্রটা লুকিয়ে ছিল আমাদের স্বভাবের মধ্যেই। আর অঙ্গীকার করতে হবে ভবিষ্যতে ওই ফাঁদে আর পা গলালে আমাদের চলবে না। ওইটে হতে পারে ইতিহাসের কাছ থেকে শিক্ষণীয়। উপনিবেশের বাইরের চিহ্নগুলো নিয়ে বেশি মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। বিশ্বায়নের যুগে ওগুলো উপনিবেশ না হলেও এড়ানো যেত না নিশ্চিত। একটা ছোটো গল্প বলেই শেষ করি তবে।

‘ইংরাজ-বর্জিত ভারতবর্ষ’-এর খোঁজে ১৯০০ সালে ভারত পর্যটন করেছিলেন ফরাসি পর্যটক পিয়ের লোটি। ভেবেছিলেন বেছে বেছে ভারতীয় দেশীয় রাজ্যগুলি ঘুরলেই ইংরেজ উপনিবেশ এড়িয়ে যেতে পারবেন তিনি। পারেননি। ত্রিবাঙ্কুরে পৌঁছে দেখলেন, সেই দেশীয় রাজ্যের অতিথিশালার স্থাপত্যে-আসবাবে উপনিবেশের হাতের ছোপ ছোপ ছাপ পড়ে আছে স্পষ্ট।

আজ এই যে আপনাদের সভাকক্ষটি— এর মধ্যেও স্পষ্ট হয়ে আছে উপনিবেশের বিবিধ চিহ্ন-সংকেত। এই চেয়ার-টেবিল সবই তাই। এসব এখন আর উপনিবেশের চিহ্ন নয়, এসব এখন ‘আমাদের’ হয়ে গেছে। যথার্থ বিকল্প ব্যবস্থা না হলে এসব এড়াতে যাওয়া এখন অর্থহীন। কিন্তু কী হতে পারে উপনিবেশের একটি ‘বিকল্প-ব্যবস্থা’? আমি বলি, আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে কোন্‌গুলো সাপেক্ষবাচী ‘উপনিবেশ’ আর কোন্‌গুলি ‘সহনিবেশ’। উপনিবেশের ইতিহাস থেকে আমরা এই শিক্ষাই নিতে পারি যে উপনিবেশ থেকে আমরা ক্রমশ সহনিবেশিত হব। এ শুধু আলগা একটা শব্দখেলা নয় অবশ্য। শব্দটি প্রয়োগের আগে যেন মনে রাখি, আমাদের দেশে শব্দকে বলা হত ‘ব্রহ্ম’!

নমস্কার।

 

 

One Thought on উপনিবেশ থেকে সহনিবেশ: একটি কল্পভাষণ / মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়

  1. I loved as much as you will receive carried out right here.
    The sketch is attractive, your authored subject mattedr stylish.
    nonetheless, you command get bought an dginess over that
    you wish be delivering the following. unwell unquestionably come more formerly again as exactly the same nearly very often inside case yoou shield this hike. https://Www.Waste-Ndc.pro/community/profile/tressa79906983/

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আজকের জলবায়ু সংকট ও জরুরি রাজনৈতিক কর্তব্য

October 31, 2023

One Thought on উপনিবেশ থেকে সহনিবেশ: একটি কল্পভাষণ / মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়

  1. I loved as much as you will receive carried out right here.
    The sketch is attractive, your authored subject mattedr stylish.
    nonetheless, you command get bought an dginess over that
    you wish be delivering the following. unwell unquestionably come more formerly again as exactly the same nearly very often inside case yoou shield this hike. https://Www.Waste-Ndc.pro/community/profile/tressa79906983/

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *