আজকের জলবায়ু সংকট ও জরুরি রাজনৈতিক কর্তব্য

স্বরান্তর  সংখ্যা ১৫

সম্পাদকীয়

আজকের জলবায়ু সংকট ও জরুরি রাজনৈতিক কর্তব্য

বিজ্ঞানীরা তাঁদের সাম্প্রতিক বিজ্ঞান গবেষণায় এই গ্রহ সম্পর্কিত নয়টি বিষয়ে লক্ষ্মণরেখা টেনে আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন: জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য কমার হার, বাতাসের স্বাভাবিক নাইট্রোজেন ও ফসফরাস চক্রে হস্তক্ষেপ, বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার স্তরে ওজোন-এর হ্রাসপ্রাপ্তি, সাগরজলের অম্লভবন, সারা বিশ্বে পানীয় জলের ব্যবহার, জমির ব্যবহারে পরিবর্তন, রাসায়নিক দূষণ ও বাতাসে এয়ারোসোল-এর পরিমাণ। এর যেকোনো একটির লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম করে যাওয়ার মানে আর তাকে ফেরানো সম্ভব নয় আগের অবস্থানে, ফলত বিপর্যয়ের শুরু, “শেষের সেদিন”, এই নীল গ্রহ থেকে মানুষ তো বটেই প্রায় সকল প্রাণেরই বিলীন হয়ে যাওয়া। এ ছাড়া, যেকোনো একটির লক্ষ্মণরেখা পেরিয়ে যাওয়া মাত্রই অন্যদেরও শুরু একে একে বিপদসীমা ছাড়িয়ে যাওয়া। মনুষ্যসমাজ যতদিন ওই লক্ষণরেখার মধ্যে নিজেকে বেঁধে রাখতে পারবে ততদিন “মানবসভ্যতার দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণের স্বাধীনতা থাকবে।”

উদ্‌বেগের বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাসের হার ও বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন চক্রে হস্তক্ষেপ—এই তিনটি ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই আমরা বিপদসীমা প্রায় পার করতে চলেছি বা চলেই গিয়েছি। এমতাবস্থায় আমাদের করণীয় কী?

প্রথমত, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকে নেট জিরো লেভেলে বেঁধে রাখা, অর্থাৎ কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসের গ্রহণ ও বর্জনে সমতাবিধান। এটা করতে হলে,

দ্বিতীয়ত যা চাই তা হলো, এই মুহূর্তে উন্নয়নের যে-মডেল আজকের বিশ্ব পুঁজিবাদ অনুসরণ করে চলেছে তার গতি শ্লথ করে কিছু হবে না, এমনকী তার গতিরোধ করেও। কেননা অন্য বিপদসীমা অতিক্রম করে যাওয়া—যথা ওজোন স্তরের ক্রমহ্রাসমানতা বা সাগরজলের অম্লতাবৃদ্ধি বা জমির গুণগত মানে বদল— থেকে অব্যাহতি মিলবে না, তাই তার বিপরীতে হাঁটতে হবে।

কথাটা নতুন কিছু নয়। সেই ১৯৭১ সালে, আজ থেকে ৫০ বছরেরও আগে ব্যারি কমোনার তাঁর দ্য ক্লোজিং সার্কল বইয়ের ‘দ্য কোয়েশ্চন অব সার্ভাইভাল’ পরিচ্ছদে লিখছেন:

আমার হাতের কাছে যেসব তথ্যপ্রমাণ আছে তার ভিত্তিতে বলতে পারি, বর্তমানে পরিবেশগত যে-অবক্ষয়ের সম্মুখীন আমরা, বিশেষ করে শিল্পোন্নত দেশগুলোতে, তাতে গোটা ইকোলজিকাল ব্যবস্থাটাই সংকটে। এমনটা চলতে থাকলে যথাযথরূপে এই সভ্য মনুষ্যসমাজকে টিকিয়ে রাখার পরিবেশগত ক্ষমতাটাই ধ্বংস হয়ে যাবে। এবং এমন একটা অবস্থার কথা ভাবতে চেষ্টারও দরকার পড়ে না যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ নেই; এমন এক সময় যখন গুরুত্বপূর্ণ ইকোলজিকাল বিষয়সমূহের অপূরণীয় ক্ষতি ঘটে যাবে।

অধ্যাপক ও জীববিজ্ঞানী কমোনার তাঁর অপর একটি বই সায়েন্স অ্যান্ড সারভাইভাল-এ জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইডের ক্রমবৃদ্ধি ও বায়োস্ফিয়ারের ওপর তার প্রভাবে ভয়াবহ বন্যা ও সমুদ্রতলের বৃদ্ধি বিষয়ে আমাদের সতর্ক করে দেন। অধুনা বহুল-ব্যবহৃত “বিশ্ব উষ্ণায়ন” বা “গ্লোবাল ওয়ার্মিং”-এর প্রসঙ্গ টেনে গত শতাব্দীর ষাটের দশকের মাঝামাঝি নাগাদই তিনি লিখেছিলেন,

এর ভয়াবহতা প্রশমিত করতে জরুরি হলো সারা পৃথিবী জুড়ে গৃহস্থ চুলা ও কলকারখানার দহন বা কমবাসচন চুলা ব্যবহারে পরিবর্তন ঘটানো।[] বিদ্যুৎ উৎপাদনে কমবাসচন পদ্ধতি [কয়লা পোড়ানো] বা নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টার-এর ব্যবহার না করে সোলার প্যানেল বা অন্য [জলবিদ্যুতের মতো] আরও অন্য উপায় গ্রহণ করা। যেখানে দরকার প্রভূত পরিমাণে যন্ত্রকৌশলগত বা টেকনোলজিকাল পরিবর্তন []

কিন্তু টেকনোলজি যে সমাধান নয় সেটা তিনি বিলক্ষণ জানতেন, টেকনোলজি শুধু যে এই আধুনিক সমাজের চমকপ্রদ বস্তুগত ভিত্তিটা গড়ে দিয়েছে তা-ই নয়, অন্যদিকে সে-ই আমাদের ঠেলে দিয়েছে বেঁচে থাকার বিপদের মুখোমুখি, যার থেকে উদ্ধার পেতে হলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলির সমাধান করতে হবে আগে। “বিজ্ঞান আমাদের সামনে এই [ইকোলজিকাল] সংকটকে তুলে ধরতে পারে, কিন্তু এর সমাধান করতে হবে সামাজিক কাজের মধ্যে দিয়ে।”

কমোনার-এর কাছে মূল সমস্যা আসলে উৎপাদনের ধরনে। মেকিং পিস উইদ দ্য প্ল্যানেট-এর ১৯৯২ সংস্করণের ভূমিকায় তিনি লিখছেন, “যেখানে পরিবেশটাই দূষিত আর অর্থনীতি ধুঁকে চলেছে সেখানে যে ভাইরাসের দরুন উভয়ের এই দশা, তার খোঁজ পাওয়া যাবে উৎপাদনের প্রণালীর মধ্যে।”

অ্যান্ডারসন, একজন মার্কসবাদী সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রী, ছিলেন কমোনার-এর কাজের দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত; তাঁর সোশিয়োলজি অব সারভাইভাল (১৯৭৬)-এ তিনি যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে উত্থাপন করছেন “পরিবেশগত ঋণ” কথাটির। অর্থাৎ পুঁজিবাদ তার উৎপাদন প্রক্রিয়া ও অর্থনীতির চাহিদা ও জোগানের অ-সম ব্যবস্থাটা টিকিয়ে রাখতে প্রকৃতি থেকে যা নেয়, তা আর ফিরিয়ে দেয় না তাকে। মার্কস-এর “মেটাবলিক রিফ্‌ট তত্ত্ব” বলতে বর্তমানে যা বোঝায়, সেই তাকেই তিনি ব্যাখ্যা করছেন এই বলে যে,

আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা নিয়ে মার্কস-এর অভিযোগ ছিল যে তা শ্রম শোষণের মতোই জমি বা মাটিকে শোষণ করার অপরাধে অপরাধী। পুঁজিপতিরা মাটি থেকে যে সম্পদ আহরণ করে তাকে প্রত্যর্পণ না করে তার থেকে নিংড়ে নেয় [হিসাব বহির্ভূত] এক কৃত্রিম উদ্‌বৃত্ত। ফলে শ্রমিক যেমন তার শ্রমের কম মূল্য পেয়ে যা আয় করে তার থেকে বেশি মূল্য উৎপন্ন করে, প্রকৃতিও তেমনি বাধ্য হয় সম্পদ তৈরির থেকে অধিক হারে তার সম্পদের সঞ্চয় খরচ করতে। পরিবেশের এই অনাদায়ী খরচের কারণে ইকোলজির টিকে থাকাটা চ্যালেঞ্জের হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের করণীয় কী বলতে গিয়ে কথাপ্রসঙ্গে অনেক কথাই এসে গেল। সারা পৃথিবীর খেটে-খাওয়া মানুষেরা কিন্তু তাদের দাবিদাওয়া ও করণীয় কী সেটা বিলক্ষণ জানেন। কিন্তু তাঁদের কথা শোনার লোক নেই। রুজি-রুটির কারণে তাঁরা একচেটিয়া পুঁজির উন্নয়নের মডেলের অনিচ্ছাকৃত অংশীদার। তবু যে-ভয়াবহ পরিবেশ সংকটের মুখোমুখি আমরা, যেখানে নানা গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে যে ক্রমশ আমাদের সভ্যতা তার অন্তিম যাত্রার দিকে এগিয়ে চলেছে সেখানে তার থেকে আরোগ্যের জন্য সমবেত মানুষের কোনো সক্রিয় উদ্যোগ নেই কেন? মনোবিদ ড্যানিয়েল গিলবার্ট আমাদের কতকগুলি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতার কথা শুনিয়েছেন। বলছেন, আমাদের মস্তিষ্ক কেবলই ঘুরপাক খায় নিম্নোদ্ধৃত কয়টি বিপদ নিয়ে, যেগুলি—

  • উদ্দেশ্যমূলক ও ব্যক্তিগত;
  • অমান্য করে নৈতিক আবেগ;
  • স্পষ্টরূপে ও অভিব্যক্তিতে বিপদজনক; এবং
  • ধীরে ধীরে পরিবর্তনের বদলে চটজলদি পরিবর্তনকে তুলে ধরে।

এখন জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়টা উপরি-উক্ত চারটে লক্ষণেরই বিপরীত। অতএব সহজেই অনুমেয় কেন আমাদের এখনও ঘুম ভাঙে না। লিজা বেনেট আমাদের মনস্তত্ত্বের আরও দিক প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত করেন: মানুষ প্রাথমিকভাবে কোনো ঝুঁকি বিষয়ে কেবলমাত্র যুক্তি দিয়েই বিচার করে না, আবেগ দিয়েও করে। একইসঙ্গে মানুষ তথ্যপ্রমাণের বিশ্লেষণে ভীষণভাবে নির্ভরশীল তার মনের গভীরে লালিত বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির ওপর। যেমন, যারা “হায়ারার্কিকাল” বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে তারা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে আস্থাশীল। অপরদিকে, যারা “সমতাবাদী” বিশ্ববীক্ষার অনুগামী তারা পরিবেশ ন্যায্যতার অধিকার আন্দোলনে অংশ নিতে আগ্রহী।

আসলে এই মুহূর্তে নয়া উদারনীতিবাদ, যা কিনা বিশ্ব পুঁজিবাদেরই ছদ্মনাম, যার নতুন গালভরা নাম “গ্রিন ক্যাপিটালিজম”, তাকে পর্যুদস্ত করতেই হবে। এই শতাব্দীর পুরো বাইশটি বছর ধরে পুঁজিবাদ ধুঁকছে, কোনোভাবেই সে স্বস্তি পাচ্ছে না। যত সে ধুঁকছে তত তার প্রবণতা আগেকার দিনের দস্যুদের লুঠতরাজের মতো এবং লুণ্ঠনের বাড়বাড়ন্তের সঙ্গে সঙ্গে একটা “যুদ্ধং দেহি” ভাব। আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যেমন তেমনই দেশের বাইরে তার দরকার কাল্পনিক শত্রু, নিজেদের ব্যর্থতা যাতে ঢেকে রাখা যায়। মিডিয়ার দৌলতে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে কন্সপিরেসি থিয়োরির মধ্যে দিয়ে একের পর এক মিথ্যার জন্ম দেয়াটা এর নিত্যদিনের কৌশল। কোভিড-১৯ প্যানডেমিকের সময়কার আমাদের অভিজ্ঞতা অন্তত সেই কথাই বলে। যৌথভাবে, আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে অতিমারি মোকাবিলার বদলে রাষ্ট্রনায়কেরা সচেষ্ট ছিলেন পরস্পরের দোষারোপে। বিশ্বের এক নম্বর ধনী ও পুঁজিবাদী দেশ আমেরিকায় অতিমারিজনিত মৃত্যুসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তার তুলনায় অনেক গরিব কিউবা বা ভিয়েতনাম অতিমারি মোকাবিলায় ছিল সামনের সারিতে।

এই মুহূর্তে পুঁজিবাদী দেশগুলির রাষ্ট্রনায়কেরা নানা জলবায়ু সম্মেলনে যে মোদ্দা কথাটা বলছেন তা হলো, বিকল্প শক্তি বা এনার্জির কথা এবং তার জন্য নতুন টেকনোলজির ব্যবহার। তাঁরা ও তাঁদের দোসর কর্পোরেট পুঁজির মালিকরা এটা খুব ভালোমতোই জানেন ব্যাপারটা সোনার পাথরবাটির তুল্য। বিকল্প শক্তি উৎপাদন করতে গেলে প্রকৃতি থেকে যে-কাঁচামাল গ্রহণ করতে হবে তার ভাণ্ডার তত মজুত যেমন নেই তেমনই জীবাশ্ম জ্বালানি ছেড়ে যদি বিদ্যুৎ শক্তির ওপর জোর পড়ে তাতে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ও সেইসঙ্গে পৃথিবীর উত্তাপ বেড়ে যাওয়া ঠেকানো যাবে না। আমরা এখানে বলতে চাইব কুবা বা কিউবা-র কথা। তাঁরা বিকল্প শক্তির বদলে নিয়েছে শক্তি সংরক্ষণের পথ। কুবা-র শক্তি উপদেষ্টা অরল্যান্ডো রে স্যান্টোস-এর মতে, “এ মুহূর্তের বড়ো সমস্যা হলো, যে-পরিমাণ এনার্জি ব্যবহৃত হচ্ছে তাতে করে পৃথিবীর এনার্জি ম্যাট্রিক্সের পরিবর্তন ঘটানো, অর্থাৎ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ব্যবহারের দিকে পুরোপুরি ঘুরে যাওয়া। কেননা প্যানেল ও উইন্ড টারবাইনের তত বিশাল ভাণ্ডার যেমন নেই, তেমনই নেই ততোধিক পরিমাণ খোলা জায়গা। সম্বল নেহাতই অপ্রতুল।” ‘কুবা প্রিপেয়ারস ফর ডিজাস্টার’-এ কুবা-বিশেষজ্ঞ ডন ফিৎজ জানাচ্ছেন, “পরিকল্পিত অর্থনীতি [পড়ুন সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি]-র এক ক্ষুদ্র দেশ পারে এমন নীতি প্রস্তুত করতে যাতে শক্তির ব্যবহারে হ্রাস টানা যায়। এতে [অর্থাৎ এনার্জি এফিসিয়েন্সি বা শক্তি সক্ষমতার দরুন] যতটুকু বাঁচানো যায় তাতে শক্তি উৎপাদনে হ্রাস টানা যায় এবং এইভাবে সর্পিলভাবে আরোই কমতে পারে শক্তির ব্যবহার। অপরদিকে, মুক্ত ও পুঁজিবাদী অর্থনীতির ক্ষেত্রে, সুপরিচিত জেভনস স্ববিরোধ (Jevons paradox) অনুযায়ী ‘এনার্জি এফিসিয়েন্সি’র দরুন যেটুকু পুঁজি সঞ্চিত হতে পারে পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রতিযোগিতার কারণে সেটার বিনিয়োগে ফের বেড়ে যেতে থাকে শক্তির ব্যবহার…”।১০ এ হলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ইকোলজিকাল দ্বান্দ্বিকতা।

আমেরিকা আজ এমনই অর্থনৈতিক সংকটে যে জলবায়ু পরিবর্তনে সে কী করবে জানে না। যুগপৎ দেশের ভিতরের ও দেশের বাইরের ক্রমবর্ধমান আর্থ-রাজনীতিক চাপে সে দিশাহীন। সম্প্রতি মন্ট্রিল-এ অনুষ্ঠিত ‘২০২২ ইউএন বায়োডাইভারসিটি কনফারেন্স’-এ পৃথিবীর ১৯০টি দেশ চুক্তিবদ্ধ হয়েছে এই বলে যে তাঁরা দেশের ভূমি ও সাগরের ৩০ শতাংশ সংরক্ষণের আওতায় রাখবে। দুর্ভাগ্য, আমেরিকা এই সম্মেলনে সরকারিভাবেই যোগ দেয়নি।১১ অথচ খোদ সেই আমেরিকাতেই জ্যাকসন, মিসিসিপি-তে অবস্থিত জ্যাকসন কোঅপারেশন, তাদের সংস্থা পরিচালনায় যেসব বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তাকে বাস্তু-সমাজতন্ত্রের প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলা চলে। সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সহ-পরিচালক কালি আকুনো নিজেদের কার্যকলাপ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে লিখছেন, পুঁজিবাদ কীভাবে, এমনকী তার জাতিবাদী ভূমিকার জন্যও, শোষণ, বঞ্চনা, অসাম্যর জন্ম দেয় ও পরিবেশের ক্ষতি করে চলে। সেখানে জ্যাকসন কোঅপারেশন কীভাবে যৌথ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সংগঠিত, সন্নিবেশিত করে “শ্রমজীবী মানুষজনকে, বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ ও ল্যাটিন সম্প্রদায়ভুক্তদের,” এবং তাদের দ্বারা “বিকল্প গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা”র মধ্যে দিয়ে “বর্তমানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে শোষণকারী, প্রবঞ্চনাকারী ও পরিবেশ ধ্বংসকারী ব্যবস্থাটার পরিবর্তন ঘটায়।” সমতা, সহযোগিতা, পরিবেশগতভাবে টেকসই, সামাজিক ও সমষ্টিগত সম্পদের সৃষ্টি ও সর্বোপরি শ্রমজীবী জনতার গণতান্ত্রিক অধিকার—এইসবের জন্য জ্যাকসন কোঅপারেশনের উদ্যোগকে অবশ্যই বলা যায় “বাস্তু-সমাজতন্ত্রের দিকে রূপান্তর”।১২ এরকম আরেক উদাহরণ স্পেনের মন্দ্রাগন কর্পোরেশন।

দেখা যাচ্ছে, পুঁজিবাদী ধনী রাষ্ট্রদের তুলনায় বরং কুবা-র মতো অপেক্ষাকৃত গরিব সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র এবং স্বাধীন ও স্ব-উদ্যোগী সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলি যে-পথ অনুসরণ করছে সেই পথ ইকো-সোশ্যালিজম বা বাস্তু-সমাজবাদের। এবং ক্রমশ পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনতার লড়াই গিয়ে মিশে যাচ্ছে পরিবেশবাদীদের লড়াইয়ের সঙ্গে। ব্রাজিলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে দেখা গিয়েছে সেই ঐক্য।

অথচ উন্নত দেশগুলোতেই সবার আগে শুরু হওয়া দরকার তথাকথিত উন্নয়নের রাশ টেনে ধরা। কর্পোরেট পুঁজি কখনোই চাইতে পারে না তা, তবু, জনগণের চোখে ধুলো দিতে তারা টেকসই/স্থিতিশীল পরিবেশের স্লোগানের পরিবর্ত হিসেবে তুলে ধরছে “টেকসই/স্থিতিশীল উন্নয়ন” বা “সাস্টেইনেবল ডেভেলাপমেন্ট”-এর স্লোগান। এই স্লোগান যে বিরাট তঞ্চকতা সেইটে প্রমাণ করতে মার্কসবাদী পরিবেশ তাত্ত্বিক কোহেই সাইতো সম্প্রতি জাপানি ভাষায় লিখেছেন ক্যাপিটাল ইন অ্যান্‌থ্রোপোসিন বইটি, যা জাপানে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছে। সেখানে তিনি মার্কস-কে উদ্ধৃত করে দেখাতে চেয়েছেন এই মুহূর্তে পরিবেশ সংকট থেকে উদ্ধার পেতে হলে সাস্টেইনেবল ডেভেলাপমেন্ট নয়, হাঁটতে হবে উলটোদিকে, বিকাশের বিপরীতে, সাইতো যাকে বলছেন “ডিগ্রোথ কম্যুনিজম”। বইটার ইংরিজি সংস্করণ প্রকাশের উদ্যোগ চলছে। সেটা প্রকাশ পেলে আরও বিশদে বোঝা যাবে তাঁর এই তত্ত্বকথা। তবে “ডিগ্রোথ” বিষয়টা আমরা কুবা-র এনার্জি এফিসিয়েন্সি-র উদাহরণ যখন আলোচনা করেছি তখন কিছুটা বলেছি।

আমাদের মনে হয়েছে পরিবেশের ব্যাপারটা আজকাল কম-বেশি সকলেই বোঝেন এবং কিছু-একটা যে করণীয় সেটাও বিলক্ষণ জানেন। কিন্তু কী উপায়ে, সেইটেই ধোঁয়াশাখিন্ন। নৃতত্ত্ববিদ্যা ও অর্থনৈতিক ভূগোলের অধ্যাপক মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ডেভিড হার্ভে “পুঁজিবাদের অভিব্যক্তির গতিপথে সাতটি আলাদা ‘সক্রিয় পরিসর’” চিহ্নিত করেছেন ও বলেছেন, পুঁজিবাদবিরোধী যেকোনো লড়াই-আন্দোলনকে শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ করতে ওইসব পরিসরগুলিতে হস্তক্ষেপ করাটা অত্যন্ত জরুরি: “টেকনোলজি ও সংগঠনের চেহারা; সামাজিক সম্পর্ক; প্রতিষ্ঠানগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা; উৎপাদন ও শ্রম প্রক্রিয়া; প্রকৃতির সঙ্গে সম্বন্ধ; দৈনন্দিন যাপনের ও প্রজাতির নিত্যদিনের জৈবজীবন; এবং ‘বিশ্ব সম্পর্কে মানসিক ধারণা’।”১৩ হার্ভে-র মতে সাতটি পরিসরের যেকোনোটিতে আন্দোলন শুরু হতে পারে, কিন্তু “কৌশল হলো রাজনৈতিক আন্দোলনকে একটি পরিসর থেকে অন্য পরিসরে চালনা করতে হয় পারস্পরিক শক্তিবৃদ্ধির উপায় অবলম্বনে।”১৪  হার্ভে এও মনে করেন যে, এই আন্দোলনে গড়ে-ওঠা “ক্ষুব্ধ, বিচ্ছিন্ন, বঞ্চিত ও অধিকারচ্যুত মানুষজনের বৃহৎ ঐক্য”র সামনের সারিতে যে জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলনকেই থাকতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। বরং তাঁর দৃঢ় আশা, এর নেতৃত্ব দেবে “যৌবনোদ্দীপ্ত ছাত্র-ছাত্রী পরিচালিত বিপ্লবী আন্দোলন”।১৫ হার্ভে-র ভবিষ্যদ্‌বাণী, না কি মার্কিন সমাজবিদ চার্লস ডেরবার-এর মন্তব্য– “অর্থনৈতিক ও পরিবেশ সংকট উভয়কে জুড়ে যে শ্রম আন্দোলন সে-ই পারবে সবুজ বিপ্লবকে সফল করে তুলতে”১৬—সেটা ভবিষ্যৎই বলবে। আমরা শুধু এই লেখা শেষ করতে চাইব বের্টোল্ট ব্রেখ্‌ট-এর একটি বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করে: “লড়াই যারা করে তারা হারতেই পারে, কিন্তু লড়াই করে না যারা তারা হেরে বসে আছে।”

 

টীকা ও সূত্রনির্দেশ

১      Rockström, Johan et al. 2009, ‘A Safe Operating Space for Humanity,’ Nature 461, pp. 472-5.

২     Barry Commoner, The Closing Circle: Nature, Man & Technology (New York: Bantam, 1971), pp.

215, 230.

৩     Commoner, Science and Survival, pp. 10–11, 125–26.

৪     Ibid.

৫     Barry Commoner, Making Peace with the Planet (New York: New Press, 1992), p. ix.

৬     Charles H. Anderson, The Sociology of Survival: Social Problems of Growth (Homewood, IL: Dorsey, 1976), p. 140

৭     Daniel Gilbert, ‘If Only Gay Sex Caused Global Warming,’ 2006, L.A. Times, 2 July, http:// articles.latimes.com/2006/jul/02/opinion/opgilbert2

৮     Lisa Bennett, ‘The Hot Spot,’ The Greater Good, 2008, Fall, pp. 40-43.

৯     Rey Santos quoted in Fitz, “Cuba Prepares for Disaster.” Resilience, March 24, 2022.

১০    Fitz, “Cuba Prepares for Disaster”. জেভনস প্যারাডক্স প্রসঙ্গে আরও বিশদে জানতে দেখুন: Foster, Clark, and York, The Ecological Rift, 169–82

১১     The New York Times, December 19, 2022.

১২    “About Us,” Cooperation Jackson, accessed June 8, 2022; Kali Akuno, “Build and Fight: The Program and Strategy of Cooperation Jackson,” in Jackson Rising: The Struggle for Economic Democracy and Black Self-Determination in Jackson, Mississippi, ed. Kali Akuno and Ajamu Nangwaya (Wakefield, Québec: Daraja, 2017), 3.

১৩    David Harvey, 2010, The Enigma of Capital and the Crises of Capitalism, New York: Oxford University Press, p. 123.

১৪    Ibid., p. 228.

১৫    Ibid., pp. 239-241.

১৬    Charles Derber, 2010, Greed to Green: Solving Climate Change and Remaking the Economy, Boulder, CO: Paradigm Publishers, p. 209.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

উপনিবেশ থেকে সহনিবেশ: একটি কল্পভাষণ / মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়

October 18, 2023

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *